মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক মণিপুরী বাড়িতে এক বেলা কাটানো নিয়ে আগেই লিখেছি জীবনজয়ীতে (এখানে পড়ুন: চারু দিদির বাড়ি)। সে লেখাতে বাড়ির কর্ত্রী চারু দিদির সৌহার্দ্য পরিপূর্ণ আতিথিয়েতার কথা লিখেছি।
চারু দিদির বাড়িতে প্রথম রাউন্ড আপ্যায়ন ও আড্ডা-গল্পের পরে, আমি বেরিয়েছিলাম ছবির মতো গ্রামখানি একটু ঘুরে দেখতে। আজ লিখছি সেই কাহিনি।
আমার তখন দোতলার জম্পেশ আড্ডায়। নিচের ঘরে তখন স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে আমাদের মাস্টারমশাইয়ের আলাপ চলছে। স্যার যেকোনো একজনকে ডেকেছেন সেই যুবকের সঙ্গে গল্প করতে। কিন্তু ওপরতলার আড্ডা ছেড়ে নিচে যেতে কারো ইচ্ছে হচ্ছে না। কয়েকজনের চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার ডাক পড়েছে। শেষমেশ কী আর করি, আমিই নিচে নেমে আসি।
নিচে নেমে পরিচয় হলো মণিপুরী যুবকের সাথে। উনি হচ্ছেন চয়ন দাদা। একটু-আধটু কথা হলো। এবার ওনার সাথে বেরিয়ে পড়লাম গ্রামটি এক পাক ঘুরে দেখতে। গ্রামে ঢোকার সময়ই এর সৌন্দর্য চোখ টেনে রেখেছে। মনে হয় যেন আঁকা ছবি। গ্রামের নাম মণিপুরীতে ‘বুকুলেইকি’।
অপরিচিত জায়গা, সঙ্গে অপরিচিত যুবক। মধ্যদুপুরে বেরিয়েছি গ্রাম ঘুরতে। একটু যেন ইতস্তত লাগছিল। কিন্তু এসব এখন কেন ভাবছি। বেরিয়ে তো পড়েছি। মাটির রাস্তা পেরিয়ে সরু পাকা রাস্তায় উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় গাছ থেকে একটি আম টুপ করে পড়ল। চয়ন দাদা সেই আম কুড়িয়ে আমার ব্যাগে ভরে দিলেন। ছোট্ট এই সৌজন্য অচেনা মানুষটার সঙ্গে আমার দূরত্ব কমিয়ে দিল।
(এখানে পড়ুন: সিলেট পানে: সাহস, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সফর)
ধীরে ধীরে দক্ষিণ মাঝের গাঁও ছেড়ে আমরা উত্তর মাঝের গাঁওয়ের দিকে এগোতে লাগলাম। মাঝের পথটুকুতে ঘিঞ্জি বাড়ি-ঘর নেই। যে কয়েকটা আছে, সবই কি সুন্দর সাজানো-গোছানো। গ্রামের চার রাস্তার মোড়ে এসে দেখি, একটা বন্ধ টং দোকান আর বিপরীতে বাঁশের তৈরি টুল। ইচ্ছে হলো এখানে বসে পা দুলিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে দিতে! কিন্তু চয়নদার ইচ্ছা, আমরা আরও উত্তরের পথে এগোতে থাকি। ঠিক আছে, হাঁটি তবে।
অদূরে দেখি এক পুকুরে মাছ ধরার বন্দোবস্ত। চয়নদা জানালেন, তিনি নাকি মাছ ধরায় খুব পটু। খালি হাতে কখনো ফেরেন না। একপ্রকার চ্যালেঞ্জ নিয়েই কার জাল, কার পুকুর এসবের তোয়াক্কা না করে মাছ ধরার কাজে নেমে পড়লেন। জাল তুলতেই অবাক হয়ে দেখি, অন্তত ১০-২০টা মাঝারি-ছোট মাছ উঠে এসেছে। আমাকেও ডাকলেন সাহায্য করতে। খলুইতে (বাঁশের তৈরি ঝুড়ি) মাছগুলো গুছিয়ে রাখলেন; একটাও নিলেন না।
আমি মজা করে বললাম, ‘ছেড়ে দেন। কার মাছ কে জানে! রাগ করবে আবার।’
চয়নদা বললেন, ‘এ গ্রামের মানুষ রাগ করে না, বরং খুশিই হবে।’
কিছুক্ষণ পর অবশ্য বুঝে গেলাম, কথাটা সত্যিই!
আমরা যখন সাঁকোতে ছবি তুলতে ব্যস্ত, তখন এক মাসি এসে হাজির। তার পরপরই এলেন পুকুরের মালিক। জানা গেল, মালিক হলেন চয়ন দাদারই বাল্যবন্ধু পলাশ দাদা। ছুটিতে বাড়িতে এসে তিন–চার দিন ধরে জাল ফেলেও নাকি একবেলা খাবার মত মাছ তুলতে পারেননি। অথচ আজ এতগুলো মাছ দেখে পলাশ দাদার মুখে শিশুসুলভ আনন্দ!
এরপর পুকুরপাড়ে আমাদের তিনজনের আড্ডা জমে উঠল। গ্রামীণ জীবন, মণিপুরী বিয়ে, সামাজিক রীতি আর উৎসব সম্পর্কিত আলাপে জমে উঠল আড্ডা। কথার ফাঁকে পলাশ দাদা তাঁদের বাড়িতে নিমন্ত্রণও করলেন। চয়নদা সময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
ফেরার পথে প্রায় অর্ধেক রাস্তা পলাশ দাদা আমাদের এগিয়ে দিলেন। বাকি পথটুকুতে চয়ন দাদার বর্ণনায় শুনতে লাগলাম এ গ্রামের গল্প, সম্পর্কের গল্প, উৎসবের গল্প। গল্প শুনতে শুনতে বাস্তবেও সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে হয় জবা ফুল, নয়তো নাম না জানা রঙিন ফুলের বাহার।
ফেরার পথে চয়নদা নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে। পুরো বাড়িতে ফুলের সমারোহ। বাড়িটা যেন ফুলেদের স্থায়ী ঠিকানা। কী অনুপম সুন্দর। গাছপাকা লিচু দিয়ে মাসি আপ্যায়ন করলেন। হাতে সময় নেই। ইচ্ছে না থাকলেও মাসির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠলাম।
চয়নদাদাসহ ফিরে গেলাম সেই স্বপ্নবাড়ি তথা চারুদির বাড়িতে। কুড়িয়ে নিলাম কিছু স্বাধীন, সহজ ও সাবলীল অনুভূতি, যেখানে অপরিচিতদেরও মনে হয় বহু বছরের পরিচিত আপনজন।
মণিপুরী এই গ্রাম, ফুলে ফুলে সেজে থাকা বাড়িগুলো, সপ্রাণ মানুষেরা; সব স্থান করে নিল আমার মণিকোঠায়।
আমি জানি একদিন আমি আবার যাব সেই গ্রামে।
(এখানে পড়ুন: দুটি কুঁড়ি একটি পাতার দেশ শ্রীমঙ্গলে)